মেনু
সর্টিং হ্যাট : এগারো বছরে কি মানুষ চেনা যায়?
Musingsofmaksud
Musingsofmaksud
Sep 15, 2026

সর্টিং হ্যাট : এগারো বছরে কি মানুষ চেনা যায়?

হগওয়ার্টসের হেডমাস্টারের ঘরে একটা তাকের ওপর সারা বছর একটা টুপি পড়ে থাকে। হাজার বছরের পুরোনো, তালি দেওয়া, ছেঁড়া, ময়লা।

যে টুপিটা নিজেই বিশ্বাস করে না ব্যবস্থাটা ঠিক আছে।

হগওয়ার্টসের হেডমাস্টারের ঘরে একটা তাকের ওপর সারা বছর একটা টুপি পড়ে থাকে। হাজার বছরের পুরোনো, তালি দেওয়া, ছেঁড়া, ময়লা। দেখতে একেবারে ফালতু জিনিস মনে হয়। বছরে একটা রাতে ওটাকে নামানো হয়, আর ওই এক রাতে ওটা প্রায় চল্লিশটা বাচ্চার পরের সাত বছর ঠিক করে দেয়। মাথায় চাপানোর পর সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে গড়ে কয়েক সেকেন্ড।

আজ এই টুপিটা নিয়ে বলব। আর একটা কথা শুরুতেই বলে রাখি, যেটা একেবারে শেষে গিয়ে কাজে লাগবে। এই ব্যবস্থাটা নিয়ে পুরো গল্পে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, সে হলো টুপিটা নিজে।

আগে ইতিহাস। টুপিটা ছিল গড্রিক গ্রিফিন্ডরের নিজের মাথার টুপি। চারজন প্রতিষ্ঠাতা যখন বুঝলেন তারা চিরকাল বেঁচে থাকবেন না, তখন প্রশ্ন উঠল, তাদের মৃত্যুর পর নতুন ছাত্রদের বেছে দেবে কে? গ্রিফিন্ডর মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিলেন, আর চারজন মিলে ওটার ভেতরে নিজেদের বুদ্ধি ঢেলে দিলেন। তার পর থেকে হাজার বছর ধরে ওই টুপি কাজটা করে যাচ্ছে।

প্রতি বছর ও নতুন একটা গান গায়। গানটা ও নিজেই বানায়, আর বানানোর জন্য গোটা একটা বছর সময় পায়। তাকের ওপর বসে বসে ও সারা বছর ওটা নিয়েই ভাবে।

এবার কাজ করার পদ্ধতি। টুপিটা মাথায় বসলে ও আপনার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলে। কথা বলে আপনার কানের ভেতরে, শুধু আপনি শুনতে পান, বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতে পারে না ভেতরে কী কথাবার্তা হচ্ছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হলো, সে শুধু আপনার ভেতরটা দেখে না। আপনি কী চান, সেটাও ও শোনে।

চারটা হাউজের মাপকাঠিগুলো ও নিজের গানেই বলে দেয়। গ্রিফিন্ডর খুঁজতেন সাহস, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, বীরত্ব। র‍্যাভেনক্ল খুঁজতেন বুদ্ধি, পড়াশোনা, তীক্ষ্ণ মন। স্লিদারিন খুঁজতেন ধূর্ততা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আর যেকোনো উপায়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর ইচ্ছা, সঙ্গে বিশুদ্ধ রক্তের শর্তও ছিল।

আর হেলগা হাফলপাফ? হাফলপাফের কোনো শর্ত ছিল না। টুপির গান অনুযায়ী তিনি বলেছিলেন, বাকি সবাইকে তিনি নেবেন, আর সবাইকে সমান চোখে দেখবেন। লোকে ভাবে হাফলপাফ হলো বাদ পড়াদের ঘর, আসলে ব্যাপারটা উলটো। চারজনের মধ্যে একমাত্র তিনিই বাচ্চা বাছাই করতে রাজি হননি। বলেছেন, সবারই ম্যাজিক শেখার অধিকার আছে। আর রোওলিং জানিয়েছেন, চার হাউজের মধ্যে সবচেয়ে কম কালো জাদুকর বেরিয়েছে ওই হাফলপাফ থেকেই। এটা মনে হয় কাকতালীয় না।

বই সিরিজে সবচেয়ে বিখ্যাত সর্টিংটা ছিল হ্যারির। হ্যারি টুলে বসল, টুপি চোখ পর্যন্ত নেমে এল, আর কানের ভেতরে কথা শুরু হলো। টুপি বলল, কঠিন। খুব কঠিন। সাহস আছে যথেষ্ট, মাথাও খারাপ না, প্রতিভা আছে, আর নিজেকে প্রমাণ করার একটা তীব্র তৃষ্ণা আছে। তারপর ও বলল আসল কথাটা, স্লিদারিনে গেলে ছেলেটা বড় কিছু হতে পারবে, সবকিছুই ওর মাথার ভেতরে আছে। আর হ্যারি মনে মনে বলতে থাকল, স্লিদারিন না, স্লিদারিন না। টুপি বলল, তুমি কি নিশ্চিত? তুমি মহান হতে পারতে। যাক, তুমি যদি নিশ্চিত হও, তাহলে – গ্রিফিন্ডর!!

খেয়াল করেন, টুপিটা কিন্তু নিজের মূল্যায়ন বদলায়নি। ও শেষ পর্যন্তও বলেনি হ্যারির মধ্যে স্লিদারিনের জিনিস নেই। ও শুধু ছেলেটার ইচ্ছাটা মেনে নিয়েছে।

দ্বিতীয় বইয়ে হ্যারি যখন পার্সেলটাংয়ের ব্যাপারটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছিল, তখন ডাম্বলডোর তাকে বলেছিলেন সেই কথাটা, যেটা এই পুরো ব্যবস্থার ভিত্তি। আমাদের ক্ষমতা না, আমাদের সিদ্ধান্তই বলে দেয় আমরা আসলে কে। আর উনিশ বছর পর, King’s Cross স্টেশনে, Harry নিজের ছেলেকেও ঠিক একই কথা বলেছিল, টুপি তোমার ইচ্ছাটাও হিসাবে ধরে।

এবার হ্যাটস্টলের ব্যাপারটা, কারণ এখানেই সবচেয়ে মজার তথ্যগুলো আছে। (এই অংশটুকু মূল সাত বইয়ের বাইরে, রোওলিংয়ের পরে লেখা থেকে জানা।) কোনো ছাত্রকে নিয়ে টুপির সিদ্ধান্ত নিতে যদি পাঁচ মিনিটের বেশি লাগে, তাহলে ওটাকে বলে হ্যাটস্টল। ব্যাপারটা বিরল, গত শতাব্দীতে হাতে গোনা কয়েকটা হয়েছে। তার একটা মিনার্ভা ম্যাকগোনাগল। তাকে নিয়ে টুপি সাড়ে পাঁচ মিনিট দোটানায় ছিল, গ্রিফিন্ডর না র‍্যাভেনক্ল।

আর দ্বিতীয়টা শুনলে অবাক হবেন। পিটার পেটিগ্রু। হ্যাঁ, সেই পেটিগ্রু, যে বন্ধুদের ধরিয়ে দিয়েছিল। তাকে নিয়েও টুপি পাঁচ মিনিটের বেশি ভেবেছিল, আর দোটানাটা ছিল গ্রিফিন্ডোর আর হাফলপাফের মধ্যে। টুপিটাও ওই ছেলেটাকে নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। এতদিনের প্রশ্নটার একটা অন্যরকম উত্তর এখান থেকে পাওয়া যায়।

এছাড়া তিনজনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় পাঁচ মিনিটের কাছাকাছি সময় লেগেছিল। হ্যারি, হারমায়োনি আর নেভিল। হারমায়োনির বেলায় দোটানাটা ছিল গ্রিফিন্ডর আর র‍্যাভেনক্ল নিয়ে।

নেভিলের গল্পটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। ছেলেটা টুলে বসে টুপিকে অনুরোধ করেছিল তাকে হাফলপাফ-এ পাঠাতে, কারণ সে নিজেকে সাহসী মনে করত না। তার ধারণা ছিল, সে গ্রিফিন্ডরের যোগ্য না। টুপি তার অনুরোধ শোনেনি। আর মজার ব্যাপার, ঘোষণা শোনার পর ছেলেটা এত ঘাবড়ে গিয়েছিল যে টুপিটা মাথায় নিয়েই টেবিলের দিকে দৌড় দিয়েছিল, পরে হাসতে হাসতে ওটা ফেরত দিয়ে আসতে হয়েছিল।

এর ঠিক উলটোটাও আছে। ড্র্যাকো ম্যালফয় টুলে বসার পর টুপিটা তার মাথা ছুঁইছুঁই করতেই চেঁচিয়ে উঠেছিল, স্লিদারিন। ভাবার দরকারই পড়েনি।

আর একটা সর্টিং আছে, যেটা একটা পুরো পরিবারকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। সিরিয়াস ব্ল্যাক। ব্ল্যাক পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্লিদারিণে গেছে, ওটাই ছিল নিয়ম, ওটাই ছিল গর্ব। টুপিটা ওই ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিল গ্রিফিন্ডরে। হাজার বছরের রক্তের হিসাব একটা ছেঁড়া টুপি এক সেকেন্ডে বাতিল করে দিল, আর ওই এক সিদ্ধান্ত থেকেই সিরিয়াসের পুরো জীবনটা তৈরি হলো, ঘর ছাড়া, নাম পোড়ানো, সব।

এবার সবচেয়ে ভারী কথাটা। সপ্তম বইয়ের শেষে স্নেইপের স্মৃতিতে একটা দৃশ্য আছে। স্নেইপ ডাম্বলডোরের সামনে দাঁড়িয়ে, আর তার ওয়ান্ড থেকে বেরিয়ে আসছে একটা রূপালি হরিণী। লিলি পটারের প্যাট্রোনাস। এত বছর পরেও।

ডাম্বলডোর তাকিয়ে থেকে বললেন, তার মাঝে মাঝে মনে হয় তারা বড্ড তাড়াতাড়ি সর্ট করে ফেলেন। তারপর তিনি হেঁটে চলে গেলেন, আর স্নেইপ ওখানে দাঁড়িয়ে রইলেন স্তব্ধ হয়ে। কথাটার মানে ভাঙলে দাঁড়ায় এই, ওই লোকটার গ্রিফিন্ডরে থাকার কথা ছিল। এগারো বছর বয়সে একটা টুপি তাকে যে হাউজে পাঠিয়েছিল, ওই হাউজটাটাই তাকে ধীরে ধীরে ডেথ ইটারদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। হগওয়ার্টসের হেডমাস্টার নিজে বলছেন, ব্যবস্থাটায় সমস্যা আছে।

আর এখানেই আমার শুরুর কথাটায় ফিরে আসি। টুপিটা নিজেও কথাটা জানে। পঞ্চম বইয়ে ও যে গানটা গেয়েছিল, ওটা আর দশটা বছরের গানের মতো ছিল না। ও সেবার ফাউন্ডারদের গল্পটা বলেছিল, কীভাবে চারজন বন্ধু ছিলেন, কীভাবে স্লিদারিন মাগলবর্ন ছাত্রদের নিয়ে গ্রিফিন্ডরের সঙ্গে ঝগড়া করে স্কুল ছেড়ে চলে গেলেন, আর কীভাবে বাকিদের মধ্যেও ঝগড়া লেগে স্কুলটা প্রায় ভেঙে পড়ছিল। তারপর সে সাবধান করে দিয়েছিল, ভেতর থেকে ভাগ হয়ে গেলে বাইরের শত্রুর দরকার পড়ে না।

আর ওই গানের সবচেয়ে করুণ লাইনটা হলো এটা, ও বলেছিল ভাগ করে দেওয়াটা ওর দায়িত্ব, তাই ওকে কাজটা করতেই হবে, যদিও ও ভয় পায় এর পরিণতি নিয়ে।

এই কথাটা একবার ভাবেন। যন্ত্রটা নিজে জানে যে কাজটা বিপজ্জনক, তবু ওকে কাজটা করে যেতে হয়, কারণ ওকে বানানোই হয়েছে ওটার জন্য। গ্রেট হলের ছাত্ররা সেবার হাততালি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কেউ কিছু বদলায়নি। টুপি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সাবধানবাণী দিয়ে যাচ্ছে, আর কেউ শোনে না।

এবার পেটিগ্রুর প্রশ্নটার উত্তর দিই। টুপি ভবিষ্যদ্বাণী করে না, ও কোনো নিশ্চয়তা দেয় না যে এই ছেলেটা সাহসী হবে। ও যা করে সেটা হলো, ও আপনাকে একটা মাপকাঠি ধরিয়ে দেয়, বলে দেয়, তুমি এই দলের লোক, এবার এই নামটার যোগ্য হয়ে দেখাও।

নেভিল ওই মাপকাঠিটা সাত বছর ধরে মেনে চলেছে। তার নিজের বিশ্বাস ছিল না, টুপির ছিল, আর ছেলেটা শেষ পর্যন্ত টুপির হিসাবটাই মিলিয়ে দিয়েছে। পেটিগ্রু ওই একই মাপকাঠি হাতে পেয়েছিল, আর ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। একই টুপি, একই হাউজ, দুই রকম মানুষ। তাই এটা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী না, এটা একটা দায়িত্ব।

আর এবার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণটা, যেটা গোটা সিরিজের শেষ যুদ্ধে ঘটে। দ্বিতীয় বইয়ে চেম্বারের ভেতরে ওই টুপির ভেতর থেকেই হ্যারি সোর্ড অফ গ্রিফিন্ডর বের করে এনেছিল, আর ডাম্বলডোর পরে বলেছিলেন, ওই তলোয়ার একমাত্র খাঁটি গ্রিফিন্ডরই ওখান থেকে বের করতে পারত।

এবার সপ্তম বইয়ের শেষ রাত। ভলডেমর্ট দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, হাউজের ভাগাভাগি আর থাকবে না, এখন থেকে সবাই স্লিদারিন। তারপর সে সর্টিং হ্যাটটা এনে নেভিল লংবটমের মাথায় চাপিয়ে দিল, আর ওটাতে আগুন ধরিয়ে দিল। উদ্দেশ্য ছিল, এই বাছাই ব্যবস্থাটার প্রতীকটাকে সবার সামনে পুড়িয়ে ছাই করা।

মাথার ওপর জ্বলন্ত টুপি নিয়ে দাঁড়িয়ে নেভিল ওটার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল সোর্ড অফ গ্রিফিন্ডর। আর ওই তলোয়ার দিয়েই সে নাগিনির মাথা কেটে ফেলল, ভলডেমর্টের শেষ হরক্রাক্স। মানে ব্যবস্থাটাকে ধ্বংস করতে গিয়ে সে নিজের হাতে ওই ছেলেটার হাতে অস্ত্র তুলে দিলে। আর ছেলেটা সেই একই, যাকে এগারো বছর বয়সে টুপি জোর করে গ্রিফিন্ডরে পাঠিয়েছিল।

তাহলে শেষ বিচারটা কী? সমালোচনাগুলো সত্যি। এগারো বছর বয়সে বাচ্চাদের ভাগ করে দিলে ওই ভাগটা সারাজীবন থেকে যায়, এক হাউজ আরেক হাউজকে সন্দেহ করে, আর স্লিদারিনের বাচ্চারা জন্মের আগেই দোষী হয়ে বসে থাকে। শেষ যুদ্ধের রাতে পুরো স্লিদারিন হাউজকে দুর্গ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, কেউ একবার জিজ্ঞেসও করেনি ওরা কোন পক্ষে, যদিও স্লাগহর্ন পরে হগসমিড থেকে বাড়তি লোকজন নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।

আবার এই একই ব্যবস্থা একটা ভীতু ছেলেকে সাত বছর ধরে বলে গেছে, তুমি সাহসীদের ঘরের লোক। আর ছেলেটা কথাটা বিশ্বাস করে ফেলেছিল।

মোট কথা, টুপিটা আপনাকে চিনতে পারে না। ও আপনাকে একটা নাম দেয়, আর সেই নামটা নিয়ে আপনি কী করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। সবচেয়ে মজার কথা হলো, একমাত্র টুপিটাই ব্যাপারটা শুরু থেকে জানত, আর প্রত্যেক বছর গান গেয়ে কথাটা বলেও গেছে।

 

JOIN THE CONVERSATION

Comments

0 Comments
User
Your comment will be reviewed before publishing.

No comments yet. Be the first to share your thoughts.

হ্যারি পটার বাংলা, Harry Potter Bangla

প্রয়োজনীয় লিংক
যোগাযোগ

+8801705-067092

Join Us

২০২৬ © হ্যারি পটার বাংলা - সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।