সালাজার স্লিদারিন: হগওয়ার্টসের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠাতা
সালাজার বিশ্বাস করতেন, হগওয়ার্টসে জাদুশিক্ষা পাওয়ার অধিকার সবার থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে মাগল বাবা-মায়ের ঘরে জন্মানো জাদুকর, অর্থাৎ মাগল-বর্নদের তিনি বিশ্বাস করতেন না।
হগওয়ার্টসের চার প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে সালাজার স্লিদারিনকে ঘিরে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি।
গড্রিক গ্রিফিন্ডরের নাম শুনলে সাহসের কথা মনে আসে, হেলগা হাফলপাফের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সবার জন্য জায়গা রাখার ধারণা, রোয়িনা র্যাভেনক্ল মানেই মেধা আর প্রজ্ঞা।
আর সালাজার?
তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সর্পভাষা, পিওর-ব্লাড নিয়ে এক ভয়ংকর পক্ষপাত এবং হগওয়ার্টসের গভীরে লুকিয়ে রাখা এমন এক গোপন কক্ষ, যেটা বহু শতাব্দী ধরে কিংবদন্তি হয়েই ছিল।
তার পুরো নাম সালাজার স্লিদারিন।
দশম শতকের কোনো এক সময়ে গড্রিক গ্রিফিন্ডর, হেলগা হাফলপাফ, রোয়িনা র্যাভেনক্ল ও সালাজার স্লিদারিন মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হগওয়ার্টস। সর্টিং হ্যাটের গানে সালাজারকে বলা হয়েছে ‘from fen’, অর্থাৎ জলাভূমির দিক থেকে আসা স্লিদারিন। তার জন্মসাল, পরিবার কিংবা জীবনের শুরুর দিক নিয়ে নির্ভরযোগ্য ‘ক্যানন’ তথ্য খুব বেশি নেই। তবে জাদুবিদ্যায় তার দক্ষতা নিয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী জাদুকর, বিশেষভাবে দক্ষ ছিলেন লেজিলিমেন্সি, অর্থাৎ অন্যের মনের ভেতর প্রবেশ করার জাদুতে। আর ছিল আরও দুর্লভ এক ক্ষমতা।
তিনি সাপের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।
এ ক্ষমতার নাম পার্সেলটাং। যারা এই ভাষা বলতে পারে, তাদের বলা হয় পার্সেলমাউথ। স্লিদারিনের এই ক্ষমতাই পরে তার হাউজের প্রতীক হিসেবে সাপ বেছে নেয়ার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিজের হাউজে সালাজার খুঁজতেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, চতুর, দৃঢ়সংকল্প আর কৌশলী শিক্ষার্থীদের। স্লিদারিন হাউজের রং সবুজ ও রূপালি, আর চার প্রাচীন উপাদানের মধ্যে এর সঙ্গে যুক্ত পানি। কমন রুমটাও হগওয়ার্টসের লেকের নিচে, ডানজনের গভীরে। জানালার বাইরে দিয়ে লেকের পানি দেখা যায় বলে পুরো ঘরে একটা সবুজাভ আলো থাকে। আরামদায়ক হওয়ার চেয়ে জায়গাটাকে বরং গম্ভীর আর রাজকীয়ই বেশি মনে হয়।
এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল।
সমস্যা শুরু হলো অন্য জায়গায়।
সালাজার বিশ্বাস করতেন, হগওয়ার্টসে জাদুশিক্ষা পাওয়ার অধিকার সবার থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে মাগল বাবা-মায়ের ঘরে জন্মানো জাদুকর, অর্থাৎ মাগল-বর্নদের তিনি বিশ্বাস করতেন না। তার ধারণা ছিল, জাদুকর পরিবারে জন্মানো, অর্থাৎ পিওর-ব্লাড শিক্ষার্থীদেরই হগওয়ার্টসে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। অন্য তিন প্রতিষ্ঠাতা এই ধারণার বিরোধিতা করেন। সবচেয়ে তীব্র বিরোধ তৈরি হয় গড্রিক গ্রিফিন্ডরের সঙ্গে।
ব্যাপারটার মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষাদ আছে।
গড্রিক আর সালাজার শুরুতে শুধু সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না, ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন। একই স্বপ্ন নিয়ে দুজন মিলে একটা স্কুল তৈরি করেছিলেন। অথচ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী কারা হবে, সেই প্রশ্নটাই তাদের আলাদা করে দিল।
তাদের বিরোধ দ্বন্দ্বযুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অফিসিয়াল হ্যারি পটার সূত্রে এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত আছে, কিন্তু ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত ‘ক্যানন’ তথ্য নেই। শেষ পর্যন্ত সালাজার হগওয়ার্টস ছেড়ে চলে যান, কিংবা বলা ভালো, অন্য প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে সেখানে আর তার থাকা সম্ভব ছিল না।
কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি একটা কাজ করে গিয়েছিলেন।
গোপনে।
হগওয়ার্টসের গভীরে তৈরি করেছিলেন একটি কক্ষ।
চেম্বার অফ সিক্রেটস!
অন্য তিন প্রতিষ্ঠাতা এর অস্তিত্ব জানতেন না। জে. কে. রোওলিংয়ের প্রকাশিত লেখায় এমন সম্ভাবনার কথা আছে যে, শুরুতে সালাজার হয়তো সেখানে এমন কিছু জাদু শেখাতে চেয়েছিলেন, যেগুলো অন্য প্রতিষ্ঠাতারা অনুমোদন করতেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার উদ্দেশ্য আরও অন্ধকার হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেখানে রাখা হয় এক বিশাল বাসিলিস্ক, এমন এক প্রাণী যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন সালাজার কিংবা তার বংশধরেরা। কক্ষটির দরজাও এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে পার্সেলটাং না জানলে সেটি খোলা সম্ভব না হয়। চেম্বারের ভেতরে সালাজার নিজের বিশাল একটি মূর্তিও তৈরি করিয়েছিলেন। এ জায়গায় মানুষটার অহংকার নিয়ে খুব বেশি অনুমানের প্রয়োজন পড়ে না।
হগওয়ার্টস প্রতিষ্ঠার প্রায় এক হাজার বছর পরও চেম্বার অফ সিক্রেটস নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে গল্প চালু ছিল। কেউ বিশ্বাস করত, কেউ করত না। দ্বিতীয় হ্যারি পটার বইয়ের নামটাই অবশ্য বলে দেয়, এই গল্পটা একেবারে গল্প হয়েই থাকেনি।
এর বেশি বললে স্পয়লার হয়ে যাবে।
সালাজারের আরও কিছু জিনিস তার পরিবারের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে গিয়েছিল। সবচেয়ে পরিচিত হলো সবুজ পাথরে ‘S’ আঁকা তার সোনালি লকেট। তার একটি ওয়ান্ডের কথাও জানা যায়, যার কোর তৈরি হয়েছিল বাসিলিস্কের শিংয়ের অংশ দিয়ে। বহু প্রজন্ম পরে সেই ওয়ান্ড পৌঁছে যায় তার এক দূরবর্তী বংশধরের হাতে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের বাইরেও এর আলাদা ইতিহাস তৈরি হয়।
সালাজারের বংশধরদের গল্পও হ্যারি পটার সিরিজে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সেটাও আপাতত থাক।
কারণ সালাজার স্লিদারিনকে নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুলটা সম্ভবত অন্য জায়গায়।
তার নামের কারণে পুরো স্লিদারিন হাউজকেই ‘খারাপ মানুষদের হাউজ’ ভাবা খুব সহজ।
হ্যারি পটারের গল্পও প্রথমদিকে আমাদের অনেকটা সেদিকেই ঠেলে দেয়। ড্র্যাকো ম্যালফয় স্লিদারিন। ডেথ ইটারদের অনেকেই স্লিদারিন থেকে এসেছে। জাদুজগতের ভয়ংকর কিছু মানুষের সঙ্গেও হাউজটির নাম জড়িয়ে আছে।
কিন্তু সেখানেই গল্প শেষ নয়।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা খারাপ গুণ নয়। কৌশলী হওয়াও নয়।
নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দৃঢ়সংকল্প থাকা তো নয়ই।
সালাজারের সমস্যাটা এই গুণগুলো ছিল না। সমস্যাটা ছিল তিনি এগুলোর সঙ্গে জন্ম ও বংশের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে মিলিয়ে ফেলেছিলেন।
স্লিদারিন হাউজের ইতিহাসেও এমন অনেক মানুষ আছে, যারা তার প্রতিষ্ঠাতার সেই পক্ষপাতকে অনুসরণ করেনি। কিংবদন্তির জাদুকর মার্লিন নাকি নিজেই ছিলেন স্লিদারিন। হোরেস স্লাগহর্ন, সেভেরাস স্নেইপসহ আরও অনেক চরিত্র দেখায়, একটি হাউজের পরিচয় তার প্রতিষ্ঠাতার সবচেয়ে অন্ধকার বিশ্বাসের মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য নয়। অফিসিয়াল হ্যারি পটার সূত্রও তাই স্পষ্ট করে, স্লিদারিনে থাকা মানেই ডার্ক উইজার্ড হওয়া নয়।
সম্ভবত সালাজার স্লিদারিনের গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ জায়গাটাও এখানেই।
একজন মানুষ একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেন।
নিজের আদর্শও রেখে যেতে পারেন।
কিন্তু হাজার বছর পর সেই প্রতিষ্ঠানের মানুষগুলো ঠিক তার মতোই হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সালাজারের রেখে যাওয়া সাপটা রয়ে গেছে।
সবুজ আর রূপালি রংও।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কৌশল আর দৃঢ়সংকল্পও।
কিন্তু তার পিওর-ব্লাড পৃথিবীর স্বপ্ন?
হগওয়ার্টস শেষ পর্যন্ত সেটাকে নিজের আদর্শ বানায়নি।
Comments