রিমাস লুপিন
ভরা জোছনা রাতে আমার মাঝে মাঝে রিমাস লুপিনের কথা মনে পড়ে। পূর্ণিমা এলেই যে মানুষটা নিজেকে ভয় পেত।
মানুষটাকে প্রথম দেখায় খুব সাধারণ মনে হয়। শান্ত, ক্লান্ত, একটু বেশিই ভদ্র। গায়ের রোবটা পুরোনো, জায়গায় জায়গায় সুতো খসে পড়া তালি দেওয়া। মুখে কয়েকটা পুরোনো গভীর কাটা দাগ, সে হাসে বড্ড কম। এই মানুষটার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর গোপন কথা।
রিমাস যখন খুব ছোট, তখন এক রাতে তাকে বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় কামড়ে দিয়েছিল ফেনরির গ্রেব্যাক নামের এক কুখ্যাত এবং হিংস্র ওয়্যারউলফ। সেই নিষ্পাপ ছেলেটার কিন্তু কোনো দোষ ছিল না। দোষ ছিল আসলে তার বাবার, ঠিক দোষও বলা যাবে না। তিনি কেবল একবার মিনিস্ট্রির এক মিটিংয়ে ওয়্যারউলফদের নিয়ে খুব বাজে কথা বলে ফেলেছিলেন। আর সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই গ্রেব্যাক কামড়ে দিল ছেলেটাকে। শাস্তিটা পেল অবুঝ শিশুটা।
সেই অভিশপ্ত রাতের পর থেকে রিমাস একজন ওয়্যারউলফ। প্রতি পূর্ণিমায় তার চেনা শরীরটা বদলে এক পশুর রূপ নেয়, নিজের ওপর তার বিন্দুমাত্র কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ডে এই জিনিসটাকে কেউ সাধারণ কোনো রোগ হিসেবে দেখে না। এটা মূলত একটা সামাজিক কলঙ্ক। যার শরীরে এই অভিশাপ লেগে আছে, তাকে উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ডে কেউ চাকরি দেয় না, কেউ নিজের ঘরে আশ্রয় দিতে চায় না, কেউ পাশে বসতেও চায় না। মানুষ তাকে দেখলে এক সেকেন্ডে আড়ষ্ট হয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। একটা ছোট বাচ্চা ছেলে, যার কোনো অপরাধ নেই, সে সারাজীবন মানুষের এই দূরে সরে দাঁড়ানো অবজ্ঞার চোখগুলোর মধ্যে বড় হলো।
অ্যালবাস ডাম্বলডোর তখন এক অনন্য মানবিক কাজ করেছিলেন। তিনি সমস্ত নিয়ম ভেঙে রিমাসকে হগওয়ার্টসে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ছেলেটা যেন পূর্ণিমার রাতে সবার অলক্ষ্যে নিরাপদে নিজের রূপ বদলাতে পারে, তাই স্কুলের সীমানার বাইরে একটা পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়ি আর একটা জ্যান্ত গাছ, মানে সেই Whomping Willow বসিয়ে দিয়েছিলেন গোপনে। এইটুকু নিঃস্বার্থ দয়ার কথা রিমাস নিজের সারাটা জীবনেও কোনোদিন ভোলেনি।
আর হগওয়ার্টসে এসেই তার জীবনে এক অলৌকিক পাওনা জুটল, তার তিনজন বন্ধু। জেমস পটার, সিরিয়াস ব্ল্যাক আর পিটার পেটিগ্রু। তারা যখন একসময় জানতে পারল তাদের প্রিয় বন্ধু একজন ওয়্যারউলফ, তারা কিন্তু বিন্দুমাত্র মুখ ঘুরিয়ে নিল না বা তাকে ফেলে চলে গেল না। উল্টো তারা বন্ধুর জন্য গোপনে বছরের পর বছর খাটুনি করে Animagus হওয়া শিখল, যেন পূর্ণিমার রাতে নিজেরা পশুর রূপ নিয়ে সেই বন্ধুর পাশে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। যেন রূপ বদলানোর পর তীব্র যন্ত্রণার রাতেও রিমাস-এর নিজেকে একা না লাগে। নিজের নখ দিয়ে সে যেন নিজেকেই ক্ষতবিক্ষত না করে। জীবনে এই একটা জিনিসই রিমাসকে আসলে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সত্যিকারের ভালোবাসা আর বন্ধুত্ব কী, এই তিন বন্ধুই তাকে প্রথম শিখিয়েছিল।
বড় হয়ে রিমাস একসময় হগওয়ার্টসে শিক্ষক হয়ে ফিরে এলেন, Defence Against the Dark Arts-এর প্রফেশনাল প্রফেসর হিসেবে। স্টুডেন্টরা একবাক্যে বলত, এত চমৎকার শিক্ষক তারা আগে কখনো পায়নি। তিনিই প্রথম হ্যারিকে প্যাট্রোনাস চার্ম শিখিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র এক বছর পরেই স্নেইপের মুখ ফসকানো এক কথায় সবাই জেনে গেল যে প্রফেসর লুপিন আসলে একজন ওয়্যারউলফ। জানার সঙ্গে সঙ্গেই রিমাস নিজের পোটলা-পুটলি গুছিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। স্কুলের কেউ তাকে তাড়ায়নি, ডাম্বলডোরও থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেই সবার সামনে থেকে সরে গেলেন। তিনি খুব ভালো করে জানতেন, এই রক্ষণশীল উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড এ কোনো বাবা-মা চাইবে না একজন বিপজ্জনক ওয়্যারউলফ তাদের আদরের সন্তানকে পড়াক।
মানুষটা সারাজীবন এই একটা কাজই করে গেছে। সমাজ তাকে ছুঁড়ে ফেলে সরিয়ে দেওয়ার আগেই সে নিজে থেকে মাথা নিচু করে আড়ালে সরে গেছে।
তারপর তার জীবনে টংক্স এল। ঝলমলে, প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটা তাকে নিজের পুরো মন দিয়ে ভালোবাসল। আর রিমাস? সে আবারও সমাজ আর নিজের ভয়ে দূরে পালাতে চাইলেন। তিনি বারবার নিজেকে ধমক দিয়ে বললেন, আমি বুড়ো, আমি প্রচণ্ড গরিব, আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি এক মারাত্মক বিপজ্জনক সত্তা। আমার সঙ্গে থাকলে জাদুদুনিয়ার সবাই তোমাকেও খারাপ চোখে দেখবে, তোমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু টংক্স তাঁর কোনো যুক্তি শোনেনি। সত্যিকারের ভালোবাসা তো কোনোদিন জাগতিক যুক্তি-বুদ্ধি মেনে চলে না।
তাদের বিয়ে হলো। একসময় টংক্সের পেটে সন্তান এল। আর ঠিক তখনই রিমাস এক মারাত্মক মানসিক ট্রমা আর ভয় পেয়ে সবাইকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিল, তার এই রক্তে থাকা আদিম অভিশাপটা যদি তার নিষ্পাপ সন্তানের শরীরেও চলে যায়? তবে তো সে নিজের বাচ্চার জীবনটাকেও নরক বানিয়ে দেবে। সেদিন হ্যারি তাকে কোনো দয়া না দেখিয়ে মুখের ওপর চরম কঠিন কিছু কথা শুনিয়েছিল, তাকে কাপুরুষ বলেছিল। আর হ্যারির সেই কঠিন সত্যি কথাটাই রিমাস-এর চোখ খুলে দেয়। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায় মাথা নিচু করে আবারও নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে এসেছিলেন।
ব্যাটল অফ হগওয়ার্টসে রিমাস আর টংক্স, দুজনেই ডেথ ইটারদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মারা গেলেন। একই রাতে, যুদ্ধক্ষেত্রের এক শীতল মেঝেতে পাশাপাশি শুয়ে রইল তাদের প্রাণহীন শরীর দুটো।
তাদের ছোট্ট ফুটফুটে ছেলে টেডি লুপিন রয়ে গেল একদম একা, এক এতিম হিসেবে। ঠিক যেমন বহু বছর আগে হ্যালোইনের এক অভিশপ্ত রাতে জেমস আর লিলিকে হারিয়ে ছোট্ট হ্যারি একা হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস যেন আবার নিজেকে এক নির্মম চক্রে পুনরাবৃত্তি করল।
জে. কে. রোওলিং একবার নিজের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রিমাসের এই ওয়্যারউলফ হওয়াটা আসলে কেবল wizarding world কোনো গল্প না, এটা আমাদের বাস্তব সমাজের এক তীব্র রূপক। আমাদের সমাজ যেসব মরণব্যাধি বা মানসিক সমস্যাকে চরম ভয় পায়, ঘৃণা করে, একঘরে করে লুকিয়ে রাখে, এটা আসলে সেইসব ভাগ্যহীন অবহেলিত মানুষের গল্প। যাদের নিজেদের কোনো দোষ নেই, অথচ সমাজকে ভালোবেসেও সারাজীবন যাদের শুধু এই মানুষের সরে দাঁড়ানো বাঁকা চোখের অবজ্ঞা সহ্য করে যেতে হয়।
আজও মেঘের আড়ালে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে, প্রতি মাসে নিয়ম করে একবার। রিমাস লুপিন আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর মতো হাজারো ক্ষতবিক্ষত ও একাকী মানুষ আমাদের বাস্তব সমাজে আজও ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে। আমরা শুধু আমাদের অন্ধ অহংকারের কারণে তাদের ভেতরের খাঁটি মানুষটাকে চিনতে পারি না।
Comments