মেনু
মেরোপি গন্ট
Musingsofmaksud
Musingsofmaksud
Oct 09, 2026

মেরোপি গন্ট

আজ মেরোপি গন্টের কথা বলি।

নামটা হয়তো অনেকেই চট করে চিনবেন না। অথচ পুরো হ্যারি পটারের মহাকাব্যিক গল্পটার আসল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল এই একটা হতভাগ্য মেয়েকে দিয়ে।

মেরোপি ছিল মূলত স্বয়ং সালাজার স্লিদারিনের শেষ রক্তধারার বংশধরদের একজন। অনেক বড় নাম, অনেক বড় বংশমর্যাদা, কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই তাদের ঘরে খাবার বলতে কিছু ছিল না। অহংকারী বাবা মারভোলো আর বিকৃতমস্তিষ্ক ভাই মরফিন তাকে দিনরাত নোংরা গালিগালাজ করত, অমানুষিক মারধর করত আর ঘরের একদম নিম্নস্তরের কাজের লোকের মতো খাটাত।

মেয়েটি জন্মসূত্রে একজন উইচ (নারী জাদুকর) ছিল। কিন্তু তার ভেতরের ম্যাজিক মোটেও কাজ করত না।

জে. কে. রোওলিংয়ের ম্যাজিকাল দুনিয়ায় এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক। তীব্র ভয় আর মানসিক ট্রমার মধ্যে থাকলে মানুষের ভেতরের জাদুকরী ক্ষমতা নাকি আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায়, অবদমিত হয়ে পড়ে। মেরোপি সারাজীবন এমন এক নরককুণ্ডে তীব্র ভয়ের মধ্যে বেঁচে ছিল যে তার অবাধ্য হাতে ম্যাজিক্যাল ওয়ান্ডটা পর্যন্ত ঠিকমতো কথা বলত না।

তাদের সেই নোংরা ঝুপড়ি ঘরের কাছের গ্রামের নাম ছিল লিটল হ্যাঙেলটন। ওখানকার সবচেয়ে বড় আর বিলাসবহুল বাড়িটায় থাকত টম রিডল সিনিয়র। প্রচণ্ড সুদর্শন, বড়লোক জমিদারের বখাটে ছেলে, আর জন্মসূত্রে একজন মাগল। রোজ সকালে সে রাজকীয় ঘোড়ায় চড়ে সেই ঝুপড়ির সামনে দিয়ে চলে যেত। মেরোপি ঘরের ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে তীব্র আকুলতা নিয়ে সেই মাগল ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকত। সে নিজের এই একতরফা ভালোলাগার কথা কাউকে কোনোদিন বলেনি। আসলে এই ধরনের গোপন কথা কাউকে বলাও যায় না। স্পেশালি এই পরিবারে যারা নিজেরা পিওর ব্লাড বলে প্রচণ্ড গর্ব করত।

একদিন এক অপরাধের দায়ে তার বাবা আর ভাই দুজনেই উইজার্ডদের জেল আজকাবানে গেল। ঘরের সেই নোংরা আঁধারে মেরোপি জীবনে প্রথমবার একা হলো, প্রথমবার স্বাধীন হলো। আর স্বাধীন হয়েই সে যা করল, সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ভুল। ডাম্বলডোরের ধারণা অনুযায়ী, মেরোপি তখন ওয়ান্ড দিয়ে নয়, এক বিশেষ লাভ পোশন খাইয়ে সেই ধনী মাগল তরুণটাকে নিজের মোহে অন্ধ করে ফেলেছিল।

কিন্তু সত্যি ভালোবাসা তো আর বোতল থেকে তরল ঢেলে কৃত্রিমভাবে বানানো যায় না। মেরোপি এই নির্মম সত্যটা বুঝতে পেরেছিল, তবে বড্ড দেরিতে।

পোশনের মোহে কিছুদিন টম তাকে পাগলের মতো ভালোবাসল। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাদের বিয়ে হলো। একসময় মেরোপির পেটে সন্তান এলো। আর ঠিক তখনই সে এক অদ্ভুত আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নিল। সে ভাবল, এবার এই কৃত্রিম ওষুধের ব্যবহার বন্ধ করে দিই। মানুষটা যদি এই দীর্ঘদিনের পথ চলায় আমাকে সত্যি একটুও ভালোবেসে থাকে, তবে সে এমনিতেই থেকে যাবে। অন্তত নিজের অনাগত সন্তানের মুখ চেয়ে হলেও তো ফেলে যাবে না।

কিন্তু টম থাকেনি। ওষুধের ঘোর কাটার পরদিনই এক তীব্র ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে সে মেরোপিকে ফেলে রেখে নিজের বিলাসবহুল জীবনে চলে গেল।

মেরোপি তখন অন্তঃসত্ত্বা। পকেটে একটা কানাকড়িও নেই। কনকনে শীতের লন্ডনের রাস্তায় সে একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছে। তখনো তার গলায় ঝুলছিল সালাজার স্লিদারিনের সেই বিখ্যাত খাঁটি সোনার ভারী লকেট, যা ছিল তার পূর্বপুরুষের শেষ চিহ্ন। ক্ষুধার তীব্র জ্বালায় ছটফট করতে করতে সেই অমূল্য লকেট সে এক দোকানে বিক্রি করে দিল মাত্র দশটা গ্যালিয়নে। পেটের তীব্র ক্ষুধার সামনে আসলে ইতিহাসের কোনো দাম থাকে না।

বছরের শেষ রাতে, অর্থাৎ ৩১শে ডিসেম্বরের এক তীব্র তুষারপাতের মধ্যে একটা মফস্বল এতিমখানার দরজায় সে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু আর চলছে না।

ছেলেটা জন্মাল। মেরোপি নিজের শেষ শক্তি দিয়ে তাকে এক পলকের জন্য কোলে নিল। তার নাম রাখল টম, তার চলে যাওয়া বাবার নামে। মাঝের নাম রাখল মারভোলো, তার অত্যাচারী দাদার নামে। তারপর ধুঁকতে ধুঁকতে বলল, সে চায় ছেলেটা যেন দেখতে হুবহু তার বাবার মতোই রাজপুত্রের মতো সুন্দর হয়।

এইটুকু শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে মেরোপি চিরতরে চোখ বন্ধ করল। সন্তান জন্মের পর সে এক ঘণ্টাও বাঁচেনি।

এই গল্পের সবচেয়ে কষ্টের এবং ট্র্যাজিক জায়গাটা কোথায় জানেন? মেরোপি একজন উইচ ছিল। সে হয়ত ইচ্ছা করলে এক ফোঁটা জাদুর ছোঁয়া দিয়ে নিজের মরণশীল প্রাণটা অনায়াসে বাঁচাতে পারত। কিন্তু সে বাঁচতে চায়নি। সে চেষ্টাই করেনি। যে মানুষটার জন্য সে নিজের পুরো সত্তা, নিজের পরিবার, নিজের ম্যাজিককে বাজি ধরেছিল, সে যখন তাকে এক নিমেষে অস্বীকার করে চলে গেল, তখন তার অবচেতন মনে বাঁচার আর কোনো কারণই অবশিষ্ট ছিল না। সে আক্ষরিক অর্থেই স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল।

সেই এতিমখানায় ফেলে যাওয়া ছেলেটাই পরবর্তীতে বড় হয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ডার্ক লর্ড হলো, যার নাম লর্ড ভলডেমর্ট।

মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক ফোঁটা স্পর্শ যে ছেলে জীবনে একবারও পায়নি, যে জন্ম নিয়েছে এক জোর করে খাইয়ে দেওয়া কৃত্রিম প্রেমের ওষুধের মোহে, ভালোবাসা জিনিসটা সে কোনোদিন বোঝেনি, বুঝতে চায়ওনি। পুরো হ্যারি পটার ইউনিভার্সে ভলডেমর্টের এই ভালোবাসাহীন অন্ধকারের শুরুটা হয়েছিল মূলত তার মায়ের এই ভাঙা হৃদয়ের অতল হাহাকার থেকে।

JOIN THE CONVERSATION

Comments

0 Comments
User
Your comment will be reviewed before publishing.

No comments yet. Be the first to share your thoughts.

হ্যারি পটার বাংলা, Harry Potter Bangla

প্রয়োজনীয় লিংক
যোগাযোগ

+8801705-067092

Join Us

২০২৬ © হ্যারি পটার বাংলা - সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।