মেনু
জেমস পটার : সোফার ওপর পড়ে থাকা এক ওয়ান্ড
Musingsofmaksud
Musingsofmaksud
Sep 06, 2026

জেমস পটার : সোফার ওপর পড়ে থাকা এক ওয়ান্ড

পনেরো বছর বয়সে তিনি একটা ছেলেকে সবার সামনে ঝুলিয়ে অপমান করেছিলেন, কোনো কারণ ছাড়াই। সতেরোতে তিনি বদলাতে শুরু করেছিলেন। বিশ বছর বয়সে গিয়ে তিনি একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন, আর মেয়েটাও তাকে ভালোবেসেছিল। একুশে তিনি খালি হাতে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

ছেলেটা মহৎ ছিল না, ছেলেটা একুশ বছর বয়সে মরে গিয়েছিল।

হ্যারি পটার তার বাবাকে কোনোদিন দেখেনি। যা জেনেছে, সবটাই লোকের মুখে শোনা।

আর লোকে যা বলত, শুনতে ভালো লাগত। জেমস পটার ছিলেন সাহসী। জেমস পটার ছিলেন মহৎ। জেমস পটার নিজের প্রাণ দিয়ে ছেলেকে বাঁচিয়েছেন। হ্যাগ্রিড একটা ছবির অ্যালবাম বানিয়ে দিয়েছিলেন, ওটাতে ছবির মানুষগুলো হাসত আর হাত নাড়ত। কেউ কোনোদিন একটা খারাপ কথাও বলেনি।

তারপর একদিন হ্যারি এমন একটা জিনিস দেখে ফেলল, যেটা কেউ তাকে বলেনি।

সে ঢুকে পড়েছিল স্নেইপের একটা স্মৃতির ভেতরে। জুন মাসের গরম এক বিকেল, পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিন, হ্রদের ধারে ঘাসের ওপর ছেলেমেয়েরা ছড়িয়ে বসে আছে। সেখানে সে দেখল পনেরো বছরের একটা ছেলেকে। ধনী ঘরের ছেলে, দেখতে সুন্দর, খেলায় ভালো, বন্ধুদের কাছে জনপ্রিয়। হাতে একটা স্নিচ, সে বারবার ওটা ছুড়ছে আর ধরছে, চারপাশে কে দেখছে সেদিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাত দিয়ে চুলটা আরও এলোমেলো করে দিচ্ছে, যেন কেউ দেখে ভাবে সে এইমাত্র ব্রুমস্টিক থেকে নেমেছে।

সেদিন ওই ছেলেটা আরেকটা ছেলেকে ধরল। রোগা, ফ্যাকাশে, একা একা গাছের নিচে বসে বই পড়ছিল। প্রথমে তার হাত থেকে ওয়ান্ড ছিটকে ফেলা হলো। তারপর তাকে উলটো করে শূন্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, সবার সামনে, জামা মুখের ওপর নেমে গেল। চারপাশে ভিড় জমে গেল, সবাই হাসছে। একজন জিজ্ঞেস করল, “ও তোমার কী করেছে?” ছেলেটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল, “ও এক্সিস্ট করে, এটাই সমস্যা।”

পুরো দৃশ্যটার ভেতরে এই এক লাইনই সবচেয়ে নিষ্ঠুর। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো কারণ নেই। ছেলেটাকে অপমান করা হচ্ছে কারণ তাকে অপমান করা যায়। আর দূরে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে ব্যাপারটা দেখছিল। লাল চুলের মেয়েটা এগিয়ে এসে থামতে বলল। ছেলেটা মেয়েটার সামনে আরও বাহাদুরি দেখাতে লাগল, বলল, “তুমি আমার সাথে একদিন বেড়াতে গেলে আমি ওকে ছেড়ে দিতে পারি।” মেয়েটার নাম Lily Evans; সে ওই ছেলেটাকে দুচোখে দেখতে পারত না। বলত, অহংকারী, অসভ্য, একটা বাজে ছেলে।

আর ওই বিকেলেই মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটা লজ্জায় আর রাগে মেয়েটাকে এমন একটা গালি দিয়ে বসল, যেটা আর কোনোদিন ফিরিয়ে নেওয়া যায়নি। বন্ধুত্বটা ওখানেই শেষ। কিন্তু ওই গল্পটা আলাদা।

হ্যারি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরোটা দেখল। এই ছেলেটাই তার বাবা?

সেদিন তার খুব খারাপ লেগেছিল। যাকে সে সারাজীবন মহৎ ভেবে এসেছে, সেই মানুষটা পনেরো বছর বয়সে একটা নিষ্ঠুর ছেলে ছিল। আর ওই যে গাছের নিচে বসা রোগা ছেলেটা, যাকে সবাই মিলে অপমান করছিল, সে-ই আজ হ্যারির সবচেয়ে অপছন্দের শিক্ষক। পরে সিরিয়াসকে জিজ্ঞেস করায় তিনি খুব সহজ একটা কথা বলেছিলেন। আমাদের বয়স তখন পনেরো ছিল। আর লুপিন স্বীকার করেছিলেন, তিনি প্রিফেক্ট ছিলেন, তিনি থামাতে পারতেন, কিন্তু থামাননি। বন্ধুদের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়ে।

মানুষ তার মৃতদের সবসময় ভালো বানিয়ে রাখে। কারণ যে চলে গেছে, তাকে নিয়ে খারাপ কথা বলা কঠিন। আর ওই ভালো নকল ছবিটার ভেতরে আসল মানুষটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

কিন্তু গল্পটার আরেকটা দিক আছে।

ছেলেটা বড় হয়েছিল। তার এক বন্ধু ছিল, নাম রিমাস। ছেলেটার শরীরে একটা কার্স ছিল, মাসে একবার সে আর মানুষ থাকত না। বন্ধুরা জেনে ফেলার পর তাকে ছেড়ে চলে যায়নি। বরং তিন বছর ধরে গোপনে একটা ভয়ানক কঠিন আর বেআইনি বিদ্যা শিখেছিল, শুধু ওই রাতগুলোতে তার পাশে থাকা যাবে বলে। অ্যানিম্যাজাস হওয়া। ভুল হলে ভয়ংকর রূপে আটকে যাবার ভয় স্বত্বেও, ধরা পড়লে আজকাবানা চলে যাবার ভয় স্বত্বেও। আর James-এর অ্যানিম্যাজাস রূপ ছিল একটা হরিণ।

আরেক বন্ধু ছিল সিরিয়াস, যার নিজের বাড়িতে জায়গা হয়নি। ষোলো বছর বয়সে ঘর ছেড়ে চলে আসা সেই ছেলেটাকে জেমসের মা-বাবা নিজের ছেলের মতো ঘরে তুলে নিয়েছিলেন। আর একদিন সেই যে রোগা ছেলেটাকে সে উলটো করে ঝুলিয়েছিল, সেই স্নেইপই এক রাতে ভয়ংকর বিপদে পড়েছিল। সিরিয়াস মজা করতে গিয়ে তাকে এমন এক জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছিল, যেখানে গেলে সে জ্যান্ত ফিরত না। সেই শ্রিকিং শ্যাকে, ভরা পূর্নিমায় যেখানে লুপিন ওয়্যারউলফ হয়ে যাচ্ছে।

খবরটা পেয়ে জেমস দৌড়ে গিয়েছিল, আর শেষ মুহূর্তে তাকে টেনে বের করে এনেছিল। লোকটা ছেলেটাকে সহ্য করতে পারত না। তবু সেই রাতে সে দৌড়ে গিয়েছিল। হয়ত তাকে বাঁচাতে, হয়ত লুপিনের হাতে মারা পড়ার পর লুপিন ধরা পরে যাবে এই ভয়ে। কেন আমরা ঠিক জানি না। জিজ্ঞেস করাও হয়নি কাউকে।

মানুষের ভেতরে ভাল খারাপ দুটো জিনিস একসাথেই থাকে। আমরা শুধু একটাকে মনে রাখতে চাই।

তারপর দুই-তিন বছরের ভেতরে ছেলেটা বদলে গেল। সিরিয়াসের ভাষায়, গর্বে ফুলে ওঠা মাথাটা একটু চুপসে গেল। সে আর কেবল মজা করার জন্য কাউকে অত্যাচার করত না। সপ্তম বর্ষে সে হলো হেডবয়। আর যে মেয়েটা তাকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নিত, সেই লিলি একদিন তার হাতটা ধরল।

বিয়ে হলো। দুজনেরই বয়স তখন বিশ।

বিশ বছর বয়সে দুজন মানুষ একটা গোপন সংগঠনে নাম লিখিয়ে ফেলল। অর্ডার অফ দ্য ফিনিক্স। যুদ্ধের তখন সবচেয়ে খারাপ সময় চলছে। ভলডেমর্টের মুখোমুখি তারা দাঁড়িয়েছিল, একবার না, তিনবার।

তারপর তাদের একটা ছেলে হলো।

তারপর একটা ভবিষ্যদ্বাণীর খবর কানে এলো, আর তাদের লুকিয়ে পড়তে হলো। গড্রিক’স হলো নামের এক ছোট গ্রামের ছোট্ট একটা বাড়ি। বাইরের কেউ যেন খুঁজে না পায়, তার জন্য ঠিকানাটা একজন বন্ধুর মনের ভেতরে তালাবন্ধ করে রাখা হলো।

ভুল বন্ধু। পিটার পেটিগ্রু। ওয়ার্মটেইল।

জেমসের কাছে একটা জিনিস ছিল, যেটা তার পরিবারে বংশপরম্পরায় চলে আসছিল। একটা ইনভিজিবিলিটি ক্লোক। সাধারণ ক্লোক না, ওটা কোনোদিন পুরোনো হতো না, কোনোদিন তার কাজ বন্ধ করত না। ওই জিনিসটা যে কত পুরোনো আর কত বড় একটা ব্যাপার, জেমস নিজেও হয়তো জানত না। মৃত্যুর কিছুদিন আগে সে ওটা ডাম্বলডোরকে দেখতে দিয়েছিল।

তাই ওই রাতে বাড়িটায় ওটাও ছিল না।

সেই রাত ছিল ১৯৮১ সালের ৩১শে অক্টোবর। হ্যালোউইনের সন্ধ্যা। বাইরে গ্রামের বাচ্চারা সেজেগুজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, জানালায় জানালায় কুমড়োর ভেতর মোমবাতি জ্বলছে, ঠান্ডা বাতাসে শুকনো পাতা উড়ছে। বাড়ির ভেতরে তিনজন মানুষ। বাবা, মা, আর দেড় বছরের একটা ছেলে। জেমস তার ওয়ান্ডটা সোফার ওপর রেখে ছেলের সাথে খেলছিলেন। ছেলেকে শূন্যে ছুড়ে দিচ্ছিলেন আর লুফে নিচ্ছিলেন, ছেলে খিলখিল করে হাসছিল। একজন মানুষ নিজের ঘরে বসে নিজের বাচ্চার সাথে খেলছে। ওই সময় কেউ হাতে অস্ত্র নিয়ে বসে থাকে না। আমাদের কারও ঘরেই কেউ থাকে না।

তখনই দরজাটা খুলে গেল।

জেমস বুঝে ফেললেন। এক মুহূর্তও লাগেনি। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “লিলি, হ্যারিকে নিয়ে যাও! ও এসে গেছে! যাও! দৌড়াও! আমি আটকে রাখছি!” তারপর খালি হাতে এগিয়ে গেলেন। ভলডেমর্ট পরে এই মুহূর্তটার কথা মনে করে হেসেছিলেন। লোকটার হাতে ওয়ান্ড ছিল না, তবু সে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

তাকে আটকে রাখতে পারেননি জেমস, এক মুহূর্তও পারেননি। তার বয়স তখন একুশ। একুশ বছর! এই বয়সে ছেলেরা ঠিকমতো বড়ই হয় না। এই বয়সে মানুষ ঠিক করতে পারে না সে জীবনে কী করবে। তবু ওই রাতে ওই একুশ বছরের ছেলেটা যা করেছিল, ওটার আর কোনো নাম হয় না।

চোদ্দ বছর পর একটা কবরস্থানে হ্যারি দাঁড়িয়ে ছিল, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই লোকটাই। দুজনের ওয়ান্ড থেকে বেরোনো আলো একটা সোনালি খাঁচার মতো তাদের ঘিরে ফেলল, আর ভলডেমর্টের ওয়ান্ডের ডগা থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল সেই মানুষগুলোর ছায়া, যাদের ওই ওয়ান্ড দিয়ে মারা হয়েছে।

বেরিয়ে এলেন একজন লম্বা, এলোমেলো চুলের মানুষ। তিনি ছেলেটার পাশে এসে দাঁড়ালেন আর বললেন, “ধরে রাখো, আর একটু ধরে রাখো। যখন সংযোগটা ভাঙবে, আমরা কয়েক মুহূর্ত থাকব। ওইটুকু সময়ের ভেতরে তুমি পোর্টকিটা ধরে চলে যাবে।” চোদ্দ বছর পর বাবা আবার ছেলের সামনে দাঁড়ালেন, আর আবার সেই একই কাজটাই করলেন। কয়েকটা মুহূর্ত কিনে দেওয়া।

তার আগেরবছর, একটা জমাট বাঁধা হ্রদের ধারে, শতখানেক ডিমেন্টর যখন ওই ছেলেটাকে ঘিরে ধরেছিল, তখন হ্রদের ওপারে সে একটা মানুষের অস্পষ্ট আকৃতি দেখেছিল। সে ভেবেছিল বাবা এসেছেন। আসলে ওখানে সে নিজেই দাঁড়িয়ে ছিল, ভবিষ্যৎ থেকে ফিরে আসা সে নিজে। তার ওয়ান্ডের ডগা থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটা রূপালি হরিণ। তার বাবার মত একটা হরিণ। ঠিক ওই হরিণটাই, যেটা একসময় পূর্ণিমার রাতে একটা নেকড়ের পাশে হাঁটত।

বাবা মরে গেলে মানুষ তাকে আর কোথাও খুঁজে পায় না। শুধু নিজের ভেতরে পায়।

আর সবার শেষে, শেষ যুদ্ধের রাতে, মরতে যাওয়ার পথে সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটা তাকে আরেকবার পাশে পেয়েছিল। বেশিক্ষণ না, কয়েক মুহূর্তের জন্য।

জেমস শুধু বলেছিলেন, “আমরা তোমাকে নিয়ে গর্ব করি।”

(সিনেমা দেখা অনেকে একটা ছোট জিনিস জানেন না। সিনেমাতে বলা হয় জেমস ছিলেন সিকার, বইয়ে তিনি সিকার না, তিনি চেজার; আর হ্যাঁ, ওই স্নিচ হাতে নিয়ে ভাব দেখানোর দৃশ্যটা সিনেমায় নেই, ওটা শুধু বইয়ে আছে।)

লোকটা সবসময় মহৎ ছিলেন না।

পনেরো বছর বয়সে তিনি একটা ছেলেকে সবার সামনে ঝুলিয়ে অপমান করেছিলেন, কোনো কারণ ছাড়াই। সতেরোতে তিনি বদলাতে শুরু করেছিলেন। বিশ বছর বয়সে গিয়ে তিনি একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন, আর মেয়েটাও তাকে ভালোবেসেছিল। একুশে তিনি খালি হাতে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

মানুষ পুরোপুরি ভালো হয় না, পুরোপুরি খারাপও হয় না। মানুষ শুধু বড় হতে হতে একদিন দেখে, সেও আগের মানুষটা আর নেই।

JOIN THE CONVERSATION

Comments

0 Comments
User
Your comment will be reviewed before publishing.

No comments yet. Be the first to share your thoughts.

হ্যারি পটার বাংলা, Harry Potter Bangla

প্রয়োজনীয় লিংক
যোগাযোগ

+8801705-067092

Join Us

২০২৬ © হ্যারি পটার বাংলা - সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।