মেনু
ফ্র্যাংক ও অ্যালিস লংবটম : একটা চুইংগামের খালি মোড়ক
Musingsofmaksud
Musingsofmaksud
Sep 15, 2026

ফ্র্যাংক ও অ্যালিস লংবটম : একটা চুইংগামের খালি মোড়ক

একই ওয়ার্ডে আরও দুটো বিছানা আছে, যেগুলো দেখে কেউ হাসে না। একটায় শুয়ে থাকেন অ্যালিস লংবটম, পাশেরটায় তার স্বামী ফ্র্যাংক লংবটম। দুজনেই একসময় অরোর ছিলেন, মানে যারা কালো জাদুকরদের ধরার কাজ করেন।

একটা চুইংগামের খালি মোড়ক।

সেইন্ট মাংগো’জ হাসপাতালের চার তলা। সিঁড়ির পাশে দেয়ালে তালিকাটা টাঙানো আছে, চার তলার নামের পাশে লেখা, ‘Spell Damage’; এই তলায় একটা বন্ধ ওয়ার্ড আছে। এখানে যারা আসে, তারা বাড়ি ফেরে না।

ওয়ার্ডের ভেতরে অনেকগুলো বিছানা। একটাতে থাকে এমন এক লোক, যে একসময় খুব বিখ্যাত ছিল, বই লিখত, ছবি তুলত। এখন সে কিছু মনে রাখতে পারে না, তবু সবাইকে হাসিমুখে সই দিতে চায়। তার অবস্থাটা দেখে লোকে হাসে। তার নাম ছিল গিল্ডেরয় লকহার্ট। কিন্তু আজকের গল্প তাকে নিয়ে না।

ওই একই ওয়ার্ডে আরও দুটো বিছানা আছে, যেগুলো দেখে কেউ হাসে না। একটায় শুয়ে থাকেন অ্যালিস লংবটম, পাশেরটায় তার স্বামী ফ্র্যাংক লংবটম। দুজনেই একসময় অরোর ছিলেন, মানে যারা কালো জাদুকরদের ধরার কাজ করেন। প্রথম যুদ্ধের সময় অর্ডার অফ দ্য ফিনিক্সের যে পুরোনো ছবিটা আছে, ওখানে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। ম্যাড-আই মুডি একদিন ওই ছবিটা হ্যারিকে দেখাচ্ছিলেন। এই দুজনের ওপর আঙুল রেখে তিনি একটা কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এদের বেলায় যা হয়েছে, তার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিল।

কী হয়েছিল? ১৯৮১ সালের শেষে ভলডেমর্ট হারিয়ে গেল, কেউ জানে না সে বেঁচে আছে কি নেই। তার কিছু অনুচর তখনো হাল ছাড়েনি, তারা ধরে নিয়েছিল লর্ড কোথায় আছেন সেটা কেউ কেউ জানে। চারজন মিলে এই দুজনকে ধরে নিয়ে গেল। বেলাট্রিক্স লেস্ট্র্যাঞ্জ, তার স্বামী রোডোলফাস, দেবর রাবাস্টান, আর বার্টি ক্রাওচ জুনিয়র।

তারপর ওই দুজনের ওপর ক্রুসিয়াটাস কার্স চালানো হলো। একবার না, বারবার। কার্সটা শরীর কাটে না, রক্ত বের করে না, শুধু ব্যথা দেয়, আর যত জোরে চালানো হয় তত বেশি। ফ্র্যাংক আর অ্যালিস কিছুই বলতে পারেননি, কারণ তারা জানতেনই না। কিছুক্ষণ পর তাদের মন ভেঙে গেল।

তারা মারা যাননি।

এই জায়গাটাই সবচেয়ে কঠিন। মরে গেলে একটা শেষ থাকত। শেষকৃত্য হত, কবর হতো, একটা পাথরে নাম লেখা থাকত। তারা বেঁচে রইলেন। শরীরটা আছে, চোখ খোলা, শ্বাস চলছে। ভেতরের মানুষ দুটো নেই। চল্লিশ বছর ধরে তারা ওই ওয়ার্ডে আছেন।

তাদের একটা ছেলে ছিল, নেভিল। ঘটনার সময় তার বয়স এক বছরের একটু বেশি। ছেলেটাকে বড় করলেন তার দাদী, অগাস্টা লংবটম। মাথায় সবসময় একটা টুপি, তার ওপর একটা শকুনের মূর্তি বসানো। কঠিন মানুষ, কথা কম, শাসন বেশি।

ওই বাড়িটার অবস্থা একবার ভাবেন। পরিবারের সবচেয়ে ভালো দুটো মানুষ শেষ হয়ে গেছে, রয়ে গেছে একটা বাচ্চা, যার মধ্যে ম্যাজিকের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আত্মীয়রা ভয় পেয়ে গিয়েছিল, ছেলেটার ভেতর থেকে ম্যাজিক বের করার জন্য তার দাদার ভাই অ্যালজি একবার তাকে দোতলার জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছিলেন। আর দাদী সারাজীবন তাকে একটা কথাই মনে করিয়ে দিতেন, তোমার বাবার মতো হতে হবে।

ছেলেটা বড় হলো এই দুটো জিনিস নিয়ে। একটা মাপকাঠি, যেটা সে ছুঁতে পারছে না। আর একটা হাসপাতাল, যেখানে ওই মাপকাঠিটা শুয়ে আছে।

পঞ্চম বইয়ে একটা দৃশ্য আছে। বড়দিনের সময় হ্যারি আর তার বন্ধুরা হাসপাতালে গিয়েছিল আর্থার উইজলিকে দেখতে, আর ফেরার পথে ভুল করে তারা চার তলার ওই ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ে। ভেতরে নেভিল দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে তার দাদী। নেভিল বন্ধুদের দেখে কুঁকড়ে গেল, মুখটা লাল হয়ে গেল। দাদী ব্যাপারটা দেখলেন, আর ছেলেটাকে ধমক দিলেন। তিনি বললেন, লজ্জা পাওয়ার কী আছে। তোমার বাবা-মা তাদের সুস্থতা বিলিয়ে দিয়েছেন এই দুনিয়াটার জন্য। এটা নিয়ে গর্ব করার কথা। নেভিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তখন এক বিছানা থেকে একজন উঠে এলেন। অ্যালিস লংবটম। গায়ে হাসপাতালের পোশাক, চুল সাদা, পাতলা হয়ে গেছে, মুখের হাড় বেরিয়ে আছে, চোখ দুটো বড় বড়। তিনি ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি জানেন না ছেলেটা কে। তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে ছেলের হাতের মুঠোয় একটা জিনিস গুঁজে দিলেন। একটা চুইংগামের খালি মোড়ক। কিছু বললেন না, কিছু বলতে পারেন না।

দাদী বিরক্ত হয়ে বললেন, আবার! অ্যালিস, ওটা ফেলে দাও। তিনি নেভিলকেও বললেন, ওটা ঝুড়িতে ফেলে দে। নেভিল মোড়কটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল, তারপর নিচু গলায় বলল, ধন্যবাদ, মা।

ঘরের কেউ কিছু বলল না। হারমায়োনির চোখ ভরে এসেছিল। ওরা এই ঘটনাটা নিয়ে পরে আর কোনোদিন কথা বলেনি।

দাদীর ওই বিরক্তি থেকেই বোঝা যায়, ব্যাপারটা প্রথমবার না। প্রত্যেকবার নেভিল আসলে তার মা এই কাজটা করেন। আর প্রত্যেকটা মোড়ক ছেলেটা জমিয়ে রাখে।

এখানে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই, শুধু ব্যাপারটা মাথায় ধরে রাখেন। একজন মানুষ কাউকে চেনেন না, তবু কিছু একটা দিতে চান, আর হাতের কাছে যা আছে তাই দেন। আর যে নিচ্ছে, সে জানে জিনিসটার কোনো দাম নেই। তবু সে ফেলে না।

এবার আরেকটা কথা, যেটা এই পোস্টের সবচেয়ে ভারী কথা। ভলডেমর্টের কাছে যে ভবিষ্যদ্বাণীটা পৌঁছেছিল, তাতে বলা হয়েছিল জুলাইয়ের শেষে জন্মানো একটা ছেলের কথা, যার বাবা-মা তিনবার তাকে রুখে দিয়েছেন। ওই বর্ণনার সঙ্গে দুটো পরিবার মিলে গিয়েছিল। পটারদের ছেলে জন্মেছিল ৩১ জুলাই, আর লংবটমদের ছেলে জন্মেছিল তার একদিন আগে, ৩০ জুলাই। দুই পরিবারই তিনবার তার মুখোমুখি হয়ে বেঁচে ফিরেছিল।

ভলডেমর্ট একটা বেছে নিয়েছিল। ডাম্বলডোর পরে হ্যারিকে ব্যাখ্যাটা দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন ভলডেমর্ট দুটো ছেলের মধ্যে সেটাকে বেছে নিয়েছিলেন যেটার সঙ্গে তার নিজের মিল ছিল। একজনের মা Muggle, অন্যজন খাঁটি বংশের। সে আয়নায় নিজেকে দেখতে পেয়েছিল হ্যারির মাঝে, তার মতই হাফ ব্লাড আর ওই দিকেই গিয়েছিল।

ওই এক সিদ্ধান্তে দুটো বাচ্চার জীবন ভাগ হয়ে গেল। একজন পেল একটা কবরস্থান, গড্রিক’স হলোতে দুটো নাম লেখা পাথর, সে ওখানে গিয়ে দাঁড়াতে পারে, ফুল রাখতে পারে। আরেকজন পেল চার তলার একটা বন্ধ ওয়ার্ড, আর হাতে গুঁজে দেওয়া একটা কাগজ।

মানুষ ভাবে সবচেয়ে বড় শোক হলো কাউকে হারিয়ে ফেলা। কিছু শোক আরও চুপচাপ। ওখানে কেউ মরে না, শুধু সামনে বসে থাকে আর চেনে না।

এবার শেষ অংশটা। পঞ্চম বছরের মাঝামাঝি একদিন সকালে খবরের কাগজে বড় করে খবর বেরোল, আজকাবান ভেঙে দশজন ডেথ ইটার পালিয়েছে। কাগজের প্রথম পাতায় ছবিগুলো ছাপা হয়েছিল, আর তার মধ্যে একটা মুখ ছিল বেলাট্রিক্স লেস্ট্র্যাঞ্জের। নেভিল ওই কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিল।

ওই দিন থেকে ডাম্বলডোর’স আর্মির ঘরে ছেলেটা বদলে গেল। সে সবার চেয়ে বেশি খাটত, হাত কাঁপা পর্যন্ত অনুশীলন করত। হ্যারি পরে বলেছিল, ওই ঘরে সবচেয়ে দ্রুত উন্নতি করেছিল নেভিল। আর সে যখন ওয়ান্ড হাতে নিত, ওটা তার নিজের ওয়ান্ড ছিল না। ওটা ছিল তার বাবার ওয়ান্ড।

তারপর সেই রাত এলো, মিনিস্ট্রির ভেতরের লড়াই। ওখানে বেলাট্রিক্স লেস্ট্র্যাঞ্জ নেভিলকে ধরে ফেলল। সে হ্যারিকে বলল, ভবিষ্যদ্বাণীটা দিয়ে দাও, নইলে ছেলেটার ওপর Curse চালাব। তারপর সে নেভিলের ওপর ক্রুসিয়াটাস কার্স চালাল। ঠিক সেই কার্স, যেটা ওই ছেলেটার মা-বাবাকে শেষ করে দিয়েছিল। আর চালাল ঠিক সেই মানুষটা। নেভিল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, নাক ভেঙে গেছে, রক্ত বের হচ্ছে। আর ওই অবস্থায় সে কথা বলার চেষ্টা করল। সে হ্যারিকে বলল, দিয়ো না।

ওই রাতে তার বাবার ওয়ান্ডটা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। পরের বছর সে নতুন একটা ওয়ান্ড নিল, প্রথমবার নিজের ওয়ান্ড। আর ওই বছর থেকেই তার ম্যাজিকে ধার লাগতে শুরু করল। কারন ওয়ান্ডলোর বলে, অন্যের ওয়ান্ড ঠিকমত কাজ করবে না।

সপ্তম বছরে ক্যাসেল চলে গেল ক্যারো ভাইবোনের হাতে, আর ওরা শাস্তি হিসেবে ছাত্রদের ওপর ক্রুসিয়াটাস কার্স চালাত। নেভিল পুরো বছর ধরে ওই শাস্তি নিয়েছে, ডাম্বলডোর’স আর্মিটা সে বন্ধ হতে দেয়নি।

শেষ রাতে ভলডেমর্ট তার মাথায় জ্বলন্ত সর্টিং হ্যাট চাপিয়ে দিয়েছিল। ওই জ্বলন্ত টুপির ভেতর থেকে ও তলোয়ার বের করে এনেছিল, আর নাগিনির মাথা কেটে ফেলেছিল, ভলডেমর্টের শেষ ভরসা। ওই একই রাতে তার দাদীও ক্যাসেলে এসেছিলেন, নাতির পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে, ছেলের জন্য প্রতিশোধ নিতে।

নেভিল পরে হগওয়ার্টসের শিক্ষক হয়েছিল, হার্বোলজি পড়াত। গাছপালার বিষয়টা, যেটা ছোটবেলা থেকে সে একটাই জিনিস ভালো পারত।

আর ওই মোড়কগুলো? সে কোনোদিন একটাও ফেলেনি।

JOIN THE CONVERSATION

Comments

0 Comments
User
Your comment will be reviewed before publishing.

No comments yet. Be the first to share your thoughts.

হ্যারি পটার বাংলা, Harry Potter Bangla

প্রয়োজনীয় লিংক
যোগাযোগ

+8801705-067092

Join Us

২০২৬ © হ্যারি পটার বাংলা - সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।